২০২০-২১ অর্থবছরে করোনাভাইরাস-সৃষ্ট দুর্যোগের সময় প্রবাসীরা এ পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছিলেন। তবে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার নয়দিন বাকি থাকতেই দেশে ২৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বাকি নয়দিনে আসা রেমিট্যান্স যুক্ত হলে এর পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, চলতি জুনের প্রথম ২১ দিনে প্রবাসীরা ১৯৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুনের একই সময়ে ১৯১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সে হিসাবে চলতি জুনে রেমিট্যান্সে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২১ জুন পর্যন্ত দেশে রেকর্ড ২৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ।’
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান তথা গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন শুরু হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গত কয়েক মাসে বৈধ পথে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এ কারণে আগের বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে ৬ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। রেমিট্যান্সের এ উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্থিতিশীলতা ফিরেছে। ডলার সংকটের কারণে ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশে রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়। ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া রিজার্ভ দুই বছরের মধ্যে অর্ধেকে নেমে আসে। তবে চলতি অর্থবছরে রিজার্ভ না কমে বাড়তে শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ১৯ জুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ওইদিন গ্রস রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশের জন্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকেও ঋণের কিস্তি বাবদ ১৩০ কোটি ডলার পাওয়া যাবে। এসব ঋণ সহায়তা যুক্ত হলে দেশের রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়বে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে হুন্ডির চাহিদা তৈরি হয় দেশ থেকে। বাংলাদেশীদের পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ বিদেশে প্রধান শ্রমবাজারগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে টাকা পাচারের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এ কারণে বিদেশে হুন্ডি কারবারিদের চাহিদাও কমে গেছে। কালোবাজারে চাহিদা কমলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে উল্লম্ফন আমরা দেখছি, সেটি তারই প্রভাব।’
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘রেমিট্যান্সের বিদ্যমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে হবে। টাকা পাচার বন্ধ হলে হুন্ডির তৎপরতাও কমে যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো বেশি উৎসাহিত হবেন। আর যে প্রবাসীরা অর্থনীতিতে এত বড় ভূমিকা রাখছেন, তাদের জন্য সরকারের দিক থেকে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়ে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। আর চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হওয়ার নয়দিন আগেই দেশে ২৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এল।